আপনার ফেসবুক এবং জিমেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং থেকে রক্ষা করার জরুরি উপায়।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ফেসবুক ও জিমেইল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যোগাযোগ, কাজ, ব্যবসা, ইউটিউব, ব্যাংকিং সবকিছুই এখন এই দুই অ্যাকাউন্টের সাথে জড়িত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ হ্যাকিংয়ের শিকার হচ্ছেন শুধুমাত্র সচেতনতার অভাবে।
এই লেখায় বা ব্লগে আমরা জানবো ফেসবুক ও জিমেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং থেকে বাঁচার ১০টি জরুরি ও কার্যকর উপায়, যা অনুসরণ করলে আপনার অ্যাকাউন্ট অনেক বেশি নিরাপদ থাকবে। আরেকটা কথা বলে রাখি এই লেখা বা ব্লগটা অনেক বড় হবে করণ এখানে দুটি বিষয় নিয়ে কথা বা লেখব ।
সূচিপত্র
শক্তিশালী ও ইউনিক পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা ।
শক্তিশালী ও ইউনিক পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়, কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার মূল কারণই হলো দুর্বল পাসওয়ার্ড। একটি নিরাপদ পাসওয়ার্ড এমন হতে হবে যা সহজে কেউ অনুমান করতে না পারে বা স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার দিয়ে ভাঙা কঠিন হয়। এজন্য পাসওয়ার্ডের দৈর্ঘ্য কমপক্ষে ১২–১৬ অক্ষরের রাখা উচিত এবং সেখানে বড় হাতের অক্ষর (A–Z), ছোট হাতের অক্ষর (a–z), সংখ্যা (0–9) ও বিশেষ চিহ্ন (@, #, $, %, !) একসাথে ব্যবহার করা জরুরি। নিজের নাম, জন্মতারিখ, ফোন নম্বর বা খুব পরিচিত শব্দ পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করলে তা সহজেই অনুমান করা যায়, তাই এসব সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলুন। যেমন rahim123 একটি দুর্বল পাসওয়ার্ড, যা সহজেই ভাঙা সম্ভব, কিন্তু R@h!m_92#Secure ধরনের পাসওয়ার্ড অনেক বেশি শক্তিশালী ও নিরাপদ, যা আপনার গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্ট ও ব্যক্তিগত তথ্যকে দীর্ঘদিন সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।
Two-Factor Authentication (2FA) চালু করুন
Two-Factor Authentication (2FA) বা দুই স্তরের প্রমাণীকরণ চালু করা আপনার অ্যাকাউন্টকে হ্যাকিং এবং অননুমোদিত প্রবেশ থেকে সুরক্ষিত রাখার একটি অতিরিক্ত ও অত্যন্ত কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সাধারণভাবে যদি কেউ আপনার পাসওয়ার্ড জেনে যায়, তবুও 2FA সক্রিয় থাকলে তারা সহজে লগইন করতে পারবে না। কারণ নতুন কোনো ডিভাইস বা অচেনা জায়গা থেকে প্রবেশ করার সময় একটি একবার ব্যবহারযোগ্য কোড (OTP) প্রয়োজন হয়, যা আপনার ব্যক্তিগত ফোন বা অথেনটিকেশন অ্যাপে আসে। এর ফলে আপনার অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ অ্যাকাউন্টে ঢোকার সুযোগ পায় না। এই সুবিধা চালু করতে সেটিংসের ভেতরে গিয়ে Security → Two-Step Verification অপশনটি সক্রিয় করতে হয়। 2FA ব্যবহার করলে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ ডেটা এবং অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি এড়াতে সাহায্য করে।
সন্দেহজনক লিংকে কখনো ক্লিক করবেন না
সন্দেহজনক লিংকে কখনোই ক্লিক করবেন না, কারণ হ্যাকিংয়ের সবচেয়ে বড় ও সাধারণ ফাঁদ হলো ফিশিং লিংক। এসব লিংক সাধারণত ভয় দেখানো বা তাড়াহুড়ো তৈরি করার ভাষায় পাঠানো হয়, যেমন “আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে”, “Verify Now” বা “Copyright Strike”। আবার অনেক সময় অচেনা ইনবক্স মেসেজ বা ইমেইলের মাধ্যমেও এই লিংক পাঠানো হয়, যাতে ব্যবহারকারী না বুঝেই ক্লিক করে ফেলে। একবার এই ধরনের লিংকে ক্লিক করলে আপনার লগইন তথ্য, ব্যক্তিগত ডেটা বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরাসরি হ্যাকারদের হাতে চলে যেতে পারে। তাই যেকোনো অচেনা বা সন্দেহজনক লিংক দেখলেই সতর্ক থাকুন এবং যাচাই ছাড়া ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন। মনে রাখবেন, Facebook ও Google কখনোই ইনবক্স বা ইমেইলের মাধ্যমে আপনার পাসওয়ার্ড বা গোপন তথ্য চাইবে না, তাই এমন কোনো অনুরোধ দেখলে সেটিকে নিশ্চিতভাবেই ফিশিং লিংক হিসেবে ধরে নেওয়াই নিরাপদ।
অজানা অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে লগইন দেবেন না
অজানা অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে কখনোই লগইন দেওয়া উচিত নয়, কারণ এটি অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার একটি বড় কারণ। অনেক সময় গেম, ফ্রি ফলোয়ার, ফ্রি লাইক বা বিভিন্ন টুল ব্যবহারের লোভ দেখিয়ে অন্য ওয়েবসাইটে ফেসবুক বা জিমেইল দিয়ে লগইন করতে বলা হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একবার এই ধরনের অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে অনুমতি দিলে তারা আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, প্রোফাইল ডেটা এমনকি অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নিতে পারে। তাই নিয়মিতভাবে আপনার অ্যাকাউন্টের সঙ্গে কোন কোন অ্যাপ বা ওয়েবসাইট যুক্ত আছে তা যাচাই করা জরুরি। এজন্য Settings → Apps & Websites অথবা Third‑party access অপশনে গিয়ে অচেনা বা অপ্রয়োজনীয় অ্যাপগুলো দ্রুত Remove করুন। এই অভ্যাসটি বজায় রাখলে আপনার অ্যাকাউন্ট অনেক বেশি নিরাপদ থাকবে এবং হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
পাবলিক WiFi ব্যবহার করার সময় সতর্ক থাকুন
পাবলিক WiFi ব্যবহার করার সময় সতর্ক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ফ্রি বা অচেনা WiFi-তে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য ও ডেটা সহজেই হ্যাকারদের হাতে চলে যেতে পারে। নিরাপদ থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হলো পাবলিক WiFi-তে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে লগইন না করা। যদি খুব প্রয়োজন হয়, তবে VPN (Virtual Private Network) ব্যবহার করে আপনার ইন্টারনেট সংযোগকে এনক্রিপ্ট করা উচিত, যাতে কেউ আপনার ডেটা চুরি করতে না পারে। এছাড়া, কাজ শেষ হওয়ার পর অবশ্যই লগআউট করুন এবং সংবেদনশীল তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। এই সতর্কতা মেনে চললে পাবলিক WiFi ব্যবহারের সময়ও আপনার তথ্য অনেক বেশি নিরাপদ থাকবে।
ব্রাউজারে পাসওয়ার্ড সেভ না করাই ভালো কেন ?
ব্রাউজারে পাসওয়ার্ড সেভ না করাই সবচেয়ে নিরাপদ অভ্যাস, কারণ এতে আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে যখন আপনি সাইবার ক্যাফে, অন্যের মোবাইল ফোন বা অফিসের শেয়ার করা কম্পিউটার ব্যবহার করেন, তখন ব্রাউজারে পাসওয়ার্ড সেভ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এসব ডিভাইসে অন্য কেউ সহজেই আপনার সেভ করা পাসওয়ার্ড দেখে নিতে বা চুরি করতে পারে। একবার যদি কোনোভাবে সেই ডিভাইসে ম্যালওয়্যার বা ট্র্যাকিং সফটওয়্যার থাকে, তাহলে আপনার সব লগইন তথ্য হ্যাকারদের হাতে চলে যেতে পারে। তাই সম্ভব হলে সব সময় নিজের ব্যক্তিগত ডিভাইস ব্যবহার করুন এবং ব্রাউজারের “Save Password” অপশনটি এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে নিরাপদ ও বিশ্বস্ত Password Manager ব্যবহার করতে পারেন, যা আপনার পাসওয়ার্ডগুলো এনক্রিপ্ট করে রাখে এবং নিরাপত্তা অনেক বেশি নিশ্চিত করে।
নিয়মিত Security Checkup করুন
নিয়মিত Security Checkup করা আপনার অনলাইন অ্যাকাউন্টকে নিরাপদ রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস। ফেসবুক ও জিমেইলসহ বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে এই অপশনটি রয়েছে, যা ব্যবহার করে আপনি খুব সহজেই আপনার অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা যাচাই করতে পারেন। Security Checkup-এর মাধ্যমে আপনি দেখতে পাবেন কোথা থেকে আপনার অ্যাকাউন্টে লগইন হয়েছে, কোন কোন ডিভাইস আপনার অ্যাকাউন্টের সাথে যুক্ত আছে এবং কোন কোন অ্যাপ বা তৃতীয় পক্ষের সার্ভিস আপনার ডেটা বা অ্যাক্সেস পাচ্ছে। এই নিয়মিত পর্যালোচনা হ্যাকিং, অননুমোদিত প্রবেশ এবং ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে দেয়। তাই মাসে অন্তত একবার Security Checkup চালানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা আপনার অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
হ্যাকিং সম্পর্কিত গুজব ও ভুয়া টিউটোরিয়াল এড়িয়ে চলুন
হ্যাকিং সম্পর্কিত গুজব ও ভুয়া টিউটোরিয়াল থেকে দূরে থাকা খুবই জরুরি, কারণ এগুলোই অনেক সময় অ্যাকাউন্ট হারানোর মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইউটিউব বা ফেসবুকে প্রায়ই এমন ভিডিও দেখা যায় যেখানে বলা হয়— “এই অ্যাপ দিয়ে আইডি সেভ করুন” বা “হ্যাক হওয়া আইডি ৫ মিনিটে ফেরত পাবেন”। বাস্তবে এসব দাবি বেশিরভাগই ভুয়া এবং ব্যবহারকারীকে ভুল পথে পরিচালিত করে। এই ধরনের ভিডিও বা টিউটোরিয়াল বিশ্বাস করে অ্যাপ ইনস্টল করা বা তথ্য শেয়ার করলে উল্টো আপনার অ্যাকাউন্ট আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়ে যায়। তাই যেকোনো নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য নেওয়ার সময় সবসময় বিশ্বস্ত ও অফিসিয়াল সোর্স অনুসরণ করুন। মনে রাখবেন, শুধুমাত্র Facebook Help Center ও Google Support থেকেই সঠিক ও নিরাপদ নির্দেশনা পাওয়া যায়, যা আপনাকে প্রতারণা ও হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে সাহায্য করবে।
ফেসবুক ও জিমেইল হ্যাকিং থেকে রক্ষা করার ১০টি উপায় ছোট করে দেখুন
- শক্তিশালী ও ইউনিক পাসওয়ার্ড ব্যবহার
- Two-Factor Authentication (2FA) চালু করা
- ফিশিং লিংক ও ভুয়া মেসেজ এড়িয়ে চলা
- অজানা অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের অ্যাক্সেস বন্ধ করা
- পাবলিক WiFi ব্যবহারে সতর্কতা
- রিকভারি ইমেইল ও ফোন নম্বর আপডেট রাখা
- লগইন এলার্ট ও সিকিউরিটি নোটিফিকেশন চালু করা
- ব্রাউজারে পাসওয়ার্ড সেভ না করা
- নিয়মিত Security Checkup করা
- ভুয়া হ্যাকিং টিউটোরিয়াল ও গুজব এড়িয়ে চলা

জাহি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন।
comment url