দেরিতে ঘুমালে কি হয় - কিভবে ঘুমাবেন তা জানুন
রাতে ঘুম পেতে দেরি হচ্ছে, নাকি ইচ্ছে করেই রাত জাগছেন? বর্তমানে এ এসে দেরিতে ঘুমানো অনেকেরই দৈনন্দিন অভ্যাস, ফোন, কাজ, পড়াশোনা, সিরিজ, সব মিলিয়ে রাত কেটে যায়। সমস্যা হলো, দেরিতে ঘুমানোর প্রভাব শুধু সকালবেলার ক্লান্তিতে থেমে থাকে না, মেজাজ, মনোযোগ, খাওয়া-দাওয়া, কাজ, এমনকি সম্পর্কেও টান পড়ে। ভালো খবর, কয়েকটা ছোট অভ্যাস ঠিক করলেই ঘুমের সময় ধীরে ধীরে ঠিক করা যায়।
পেজসূচিপত্র:উপরে সূচিপত্র দেয়া হল ।
দেরিতে ঘুমালে কী হয়, শরীর ও মস্তিষ্কে আসলে কী বদলায়
আমাদের শরীর একটা ভেতরের ঘড়ি মেনে চলে, যাকে অনেকেই সার্কাডিয়ান রিদম বলে। সহজ করে বললে, আলো-অন্ধকার, খাওয়া, কাজ, আর অভ্যাস দেখে শরীর ঠিক করে কখন জেগে থাকবে, কখন ঘুমাবে। আপনি যদি নিয়মিত রাত ১টা-২টায় ঘুমান, শরীরও ধীরে ধীরে সেটাকেই “স্বাভাবিক” ধরে নিতে শুরু করে। এতে সকালে উঠতে কষ্ট হয়, দিনভর ঝিমুনি আসে, আবার রাতে ঘুম ভাঙতে দেরি হয়। এক ধরনের চক্র তৈরি হয়।
ঘুম কম হলে মস্তিষ্ক পুরোপুরি “রিসেট” হতে পারে না। ঘুমের কিছু অংশে স্মৃতি গুছিয়ে নেওয়া, শেখা জিনিস ধরে রাখা, আবেগ সামলানো, এসব কাজ চলে। দেরিতে ঘুমালে বা কম ঘুমালে অনেকের ক্ষেত্রে পরদিন মাথা ভার লাগে, মনোযোগ ছুটে যায়, ছোট কথায় রাগ ওঠে। এটা দুর্বল মনোবল না, শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
হরমোনের দিক থেকেও প্রভাব পড়তে পারে। রাত জাগলে স্ট্রেসের অনুভূতি বাড়তে পারে, ক্ষুধা বেড়ে যেতে পারে, মিষ্টি বা বেশি কার্ব খেতে ইচ্ছে করে। কারণ শরীর তখন দ্রুত শক্তি চাইছে, আর ক্লান্ত অবস্থায় “চটজলদি আরাম” খোঁজে। আবার দেরিতে ঘুম, অনিয়মিত খাওয়া, আর স্ক্রিনের আলো মিলিয়ে অনেকের ঘুম হালকা হয়ে যায়, মাঝরাতে ভাঙে, সকালে উঠেই মনে হয় ঘুমই হলো না।
আরেকটা বাস্তব দিক হলো, রাতের নিরিবিলি সময়ে চিন্তা বেশি চেপে বসে। দিনের বেলা যেটা সামলানো যায়, রাতে সেটাই বড় হয়ে আসে। এতে ঘুম আরও পিছিয়ে যায়, দুশ্চিন্তা আরও বাড়ে, আবার পরদিন কাজে ভুল হয়। ঘুমের সমস্যা অনেক সময় একা আসে না, এটা লাইফস্টাইলের সাথে জড়িয়ে থাকে।
পরদিনের লক্ষণ, ঘুম কম হলে যেগুলো দ্রুত টের পাবেন
- চোখ জ্বালা, চোখ ভার, বারবার হাই তোলা
- মাথা ভার, শরীর ধীর লাগা
- খিটখিটে মেজাজ, ধৈর্য কমে যাওয়া
- মনোযোগ কমা, কাজ করতে সময় বেশি লাগা
- কফি বা চা ছাড়া “চালু” না হওয়া
- ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া, বিশেষ করে মিষ্টি বা ভাজা
- টাইপিং, হিসাব, সিদ্ধান্তে ছোট ছোট ভুল
দীর্ঘদিন দেরিতে ঘুমালে সম্ভাব্য ক্ষতি, ওজন, ত্বক, হজম, হৃদ্স্বাস্থ্য, মানসিক চাপ
দীর্ঘদিন ঘুম কম হলে শরীরের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের সিগন্যাল এলোমেলো হতে পারে। তখন পেট ভরা থাকলেও খেতে ইচ্ছে করে, বা রাতের দিকে বেশি খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। স্ট্রেসের মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে রক্তচাপ ওঠানামা করতে পারে, শরীর “সব সময় টেনশনে” আছে এমন অনুভূতি তৈরি হয়।
ইমিউন সাপোর্টও অনেকটা ঘুমের উপর নির্ভর করে, তাই ঘুম খারাপ হলে সহজে সর্দি লাগা বা দুর্বল লাগা বাড়তে পারে। হজমের ক্ষেত্রেও প্রভাব দেখা যায়, রাত জাগা, দেরিতে খাবার, কম ঘুম, এগুলো মিললে গ্যাস্ট্রিক, বুকজ্বালা, পেট ফাঁপার মতো সমস্যা বাড়তে পারে। ত্বকেও ছাপ পড়ে, মুখ মলিন লাগে, চোখের নিচে কালচে ভাব বাড়ে। মানসিক চাপ, উদ্বেগ, মন খারাপ, এগুলোও ঘুমের সাথে দুই দিক থেকেই জড়িত, ঘুম কম হলে মুড সামলানো কঠিন হয়, আবার মুড খারাপ হলে ঘুমও আসে না।
আপনি কেন দেরিতে ঘুমান, মূল কারণ চিহ্নিত করলে সমাধান সহজ
একেকজনের ঘুম দেরি হওয়ার কারণ একেক রকম। কারও কাজের চাপ, কারও পড়াশোনা, কারও আবার “রাতে শান্তি লাগে”। তাই একটাই সমাধান সবার জন্য কাজ করবে না। আগে নিজের ট্রিগারটা ধরুন, তারপর সেটাকে লক্ষ্য করে বদল আনুন।
অনেকের ক্ষেত্রে দেরিতে ঘুম শুরু হয় ছোট অভ্যাস থেকে, যেমন রাতে বিছানায় গিয়ে ফোন দেখা। “আরও ৫ মিনিট” করতে করতে ঘড়ি এগোয়। কেউ রাত ৭টা-৮টার পর কফি খেয়ে ফেলেন, ফলে শরীর জেগে থাকে। কেউ সারাদিন ক্লান্ত থাকলেও দিনে একদম নড়াচড়া করেন না, ফলে রাতে ঘুমের চাপ তৈরি হয় না। আবার কারও ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা, পারিবারিক টেনশন, বা কাজের অনিশ্চয়তা রাতে মাথায় ঘোরে, ঘুম উধাও হয়।
নিজেকে একটা কথা বলুন, “আমি খারাপ ঘুমাই” এটা পরিচয় নয়, এটা একটা অভ্যাসের ফল। অভ্যাস বদলালে ফল বদলায়।
ফোন, স্ক্রিন টাইম, রাতের কফি, অনিয়মিত রুটিন, দুশ্চিন্তা
- নীল আলো মস্তিষ্ককে দিন-দিন ভাবায়, ঘুম পিছিয়ে যায়
- নোটিফিকেশন মনকে জাগিয়ে রাখে, “আরেকবার দেখি” চলতেই থাকে
- রিল, গেম, সিরিজ মাথা উত্তেজিত করে, ঘুমের শান্ত মোড আসে না
- রাত ৬টার পর ক্যাফেইন নিলে অনেকের ঘুম দেরি হয়
- ভারী খাবার বা ঝাল রাতে হজমে চাপ দেয়, ঘুম ভাঙতে পারে
- ওভারথিংকিং শরীরকে টেনশনে রাখে, ঘুম আসতে চায় না
- শিফট কাজ বা রাত জাগা পড়াশোনা রুটিন ভেঙে দেয়
আপনার ঘুমের অভ্যাস পরীক্ষা, সহজ ৩টি প্রশ্নে নিজের সমস্যা ধরুন
- বিছানায় যাওয়ার পর সাধারণত কত মিনিটে ঘুমান?
- সপ্তাহান্তে আপনি কতটা দেরি করে ওঠেন?
- রাতে বিছানায় শুয়ে কতবার ফোন হাতে নেন?
যদি ৩০ মিনিটের বেশি লাগে, রুটিন আর স্ক্রিন টাইম আগে ঠিক করুন। সপ্তাহান্তে ২ ঘণ্টার বেশি দেরি হলে আপনার বডি ক্লক গুলিয়ে যাচ্ছে। রাতে বারবার ফোন দেখলে, ঘুমের সবচেয়ে বড় বাধা আপনার হাতেই আছে।
কীভাবে সময়মতো ঘুমাবেন, ৭ দিনের সহজ ঘুম ঠিক করার প্ল্যান
লক্ষ্য এক রাতেই রাত ১২টা থেকে ১০টায় নামা না। লক্ষ্য হলো ৭ দিনে ধীরে ধীরে ১৫-২০ মিনিট করে এগোনো। প্রথমে “উঠার সময়” ঠিক করুন, তারপর “ঘুমানোর সময়” ঠিক হবে। সপ্তাহজুড়ে একই সময়ে উঠুন, এমনকি ছুটির দিনেও। রাতে ঘুম কম হলেও পরদিন এই নিয়ম ভাঙবেন না, এতে শরীর দ্রুত শিখে ফেলে।
দিন ৫-৭: আপনার লক্ষ্যে পৌঁছানো পর্যন্ত একইভাবে এগোন।
এখানে গোপন কথা হলো, বিছানায় যাওয়া মানেই ঘুমানো না, বিছানায় যাওয়া মানে “শরীরকে সংকেত দেওয়া”।
রাতের রুটিন সেট করুন, ঘুমানোর ৬০ মিনিট আগে কী করবেন
একসাথে সব করবেন না, প্রথমে ২টা দিয়ে শুরু করুন।
- ঘরের আলো একটু কমান
- ফোন চার্জে দিয়ে দূরে রাখুন
- ৫ মিনিট হালকা স্ট্রেচিং
- কুসুম গরম পানি দিয়ে হাত-মুখ ধোয়া বা ছোট গোসল
- ৩ লাইনের জার্নালিং, আজ কী হলো, কাল কী করবেন
- ৪-৬ শ্বাস, ৪ গুনে শ্বাস নিন, ৬ গুনে ছাড়ুন
- হালকা বই পড়ুন, স্ক্রিন নয়
সকালের রুটিন যা রাতে ঘুম আনতে সাহায্য করে
সকালে নির্দিষ্ট সময়ে উঠলে শরীরে “ঘুমের চাপ” ঠিকভাবে জমে। এতে রাতে ঘুম সহজ হয়।
- একই সময়ে ওঠা, ছুটির দিনেও
- ১০-১৫ মিনিট রোদে থাকা, জানালার পাশে হলেও চলবে
- দুপুরের পর ক্যাফেইন কমানো
- দিনে ২০-৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম
- পাওয়ার ন্যাপ নিলে ২০ মিনিটের বেশি নয়
যদি ঘুম না আসে, বিছানায় পড়ে না থেকে কী করবেন
“২০ মিনিট নিয়ম” কাজে দেয়। শুয়ে আছেন, ঘুম আসছে না, ঘড়ি না দেখলেও বোঝা যায়।
কম আলোতে বিছানা ছেড়ে উঠে বসুন। শান্ত কিছু করুন, বইয়ের দুই পাতা, হালকা শ্বাস-প্রশ্বাস, বা ধীর মিউজিক (ফোনে নয়, হলে টাইমার দিয়ে)। ফোন স্ক্রল করবেন না। ঘুম ঘুম লাগলেই আবার বিছানায় ফিরুন। রাতে মাথা ভরা চিন্তা কমাতে, ঘুমাতে যাওয়ার আগে পরদিনের টু ডু ৫ লাইনে লিখে রাখুন, মস্তিষ্ক তখন “ধরে রাখার” কাজ থেকে ছুটি পায়।
খাবার ও পরিবেশ, ঘুমের জন্য ঘর কীভাবে সাজাবেন
একটা ছোট চেকলিস্ট মনে রাখুন:
- রাতের খাবার ঘুমের ২-৩ ঘণ্টা আগে
- ভারী, বেশি ঝাল, বেশি তেল এড়িয়ে চলা
- পানি পরিমিত, ঘুমের ঠিক আগে বেশি না
- অ্যালকোহল বা ধূমপান থাকলে কমানোর চেষ্টা, এগুলো ঘুম ভাঙাতে পারে
- ঘর ঠান্ডা আর অন্ধকার, সম্ভব হলে পর্দা টানুন
- শব্দ কম, দরকার হলে ইয়ারপ্লাগ
- বিছানা পরিষ্কার, বালিশ আরামদায়ক
কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন
৩-৪ সপ্তাহ চেষ্টা করেও ঘুম ঠিক না হলে সাহায্য নিন। জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে যাওয়ার মতো লাগা, দিনের বেলা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব, ডিপ্রেশন বা তীব্র উদ্বেগ, ঘুমের ওষুধে নির্ভরতা, এগুলো সতর্ক সংকেত। চিকিৎসক বা স্লিপ স্পেশালিস্ট আপনার জন্য নিরাপদ পথ দেখাতে পারেন।
উপসংহার
দেরিতে ঘুমালে পরদিনের ক্লান্তি চোখে পড়ে, কিন্তু ধীরে ধীরে প্রভাব পড়ে মুড, ক্ষুধা, কাজের মান, আর শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে। সুখের কথা, সমাধান খুব জটিল না, ছোট অভ্যাস বড় ফল দেয়। আজই একটা পরিবর্তন বেছে নিন, একই সময়ে ওঠা, বা ঘুমানোর ৬০ মিনিট আগে ফোন দূরে রাখা। ৭ দিন সময় দিন, তারপর নিজেই টের পাবেন, সকালটা হালকা লাগছে। আপনার জন্য সবচেয়ে কঠিন বাধাটা কোনটা, স্ক্রিন, কফি, নাকি দুশ্চিন্তা?
